গত বছরে বগুড়ায় ৪১১ জনের আত্মহত্যা, ৫ বছরে দেড় হাজার
মাসুদুর রহমান রানা: বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। গত বছর ২০২৫ সালে জেলার ১২টি উপজেলায় চারশ’ ১১ জন আত্মহত্যা করেছে। আত্মহননকারীদের একটি বড় অংশই হলো নারী ও শিক্ষার্থী। হতাশা, বিষন্নতা, প্রেম ঘটিত বিষয়সহ নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে পাওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত বছর বগুড়া জেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যা করে। তার মধ্যে সদরে ১০০ জন, শাজাহানপুরে ৩২ জন, শিবগঞ্জে ৩৭ জন, সোনাতলায় ২০ জন, গাবতলীতে ২৬ জন, সারিয়াকান্দিতে ২৭ জন, আদমদিঘীতে ৩৫ জন, দুপচাঁচিয়ায় ৩৭ জন, নন্দীগ্রামে ১৬ জন, কাহালুতে ২১ জন, শেরপুরে ৩২ জন, ও ধুনটে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে জেলায় ৩৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন ও ২০২২ সালে ৩৮৫ জন করে। সব মিলিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বগুড়া জেলায় মোট এক হাজার ৫১৮ জন আত্মহত্যা করেছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: আতোয়ার রহমান বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক কারণে হতাশা থেকে মানুষ বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষপানেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন আইন প্রয়োগ করে আত্মহত্যা ঠেকানো সম্ভব নয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। মূলত হতাশা থেকে মানুষ আত্মহত্যা করছে। শারীরিক, মানসিক কারণে ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ, তরুণী, নারীসহ সব বয়সী মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
সিজোফেনিয়া, উদ্বেগ ও গোলযোগসহ নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যা করছে। তিনি বলেন, কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কাউন্সিলিং করতে হবে। আত্মহত্যা রোধে গণ সচেতনতা বাড়াতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বগুড়ার গবেষক ডা. মিজানুর রহমান তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, শুধু বগুড়া নয়, সারাদেশেই আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। সেইসাথে সারা বিশ্বেও আত্মহত্যার হার বেড়ে গেছে। গত ৫০ বছরে বিশ্বে আত্মহত্যার হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা।
স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষন্নতায় ভুগছেন। গত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী এই রোগের ব্যাপকতা বেড়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ডা. মিজানুর রহমান বলেন, বগুড়ায় আত্মহত্যা ও সামাজিক অপরাধ প্রবণতা উদ্বেগজনক।
আতঙ্কিত বিষয় হলো বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছেই। বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক সমস্যায় আত্মহত্যা করে ৪১ দশমিক ২ শতাংশ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
এছাড়া বৈবাহিক সমস্যায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, হৃদয়ঘটিত কারণে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, বিবাহ বহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্কের কারণে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, স্বামীর নির্যাতনে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, আর্থিক কারণে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের ৯৫ ভাগই মানসিক রোগী।
বিশ্লেষকরা বলেন, পারিবারিক ও সামজিক সমস্যার কারণে দেশে আত্মহত্যা বাড়ছে। সবাই অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছেন এইজন্য সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। কর্মজীবী বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদের সেভাবে সময় দেন না। সবকিছুই এখন ডিভাইস নির্ভর হয়ে গেছে।
এটিও একটি কারণ। ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক দুটোরই বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত গভীর ডিপ্রেসনে চলে যাচ্ছেন। এছাড়া সমাজে নানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতাও। এ থেকে বের হয়ে আসতে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। এজন্য সবার আগে সচেতন হতে হবে পরিবারকে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।
পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদে-মসজিদে আত্মহত্যার ধর্মীয় ও সামাজিক কুফল সম্পর্কে বুঝাতে হবে। বিশ্লেষকরা বলেন, এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি স্পর্শকাতর। তাদের এমন কোন কথা বলা যাবে না, যা বুলিংয়ের পর্যায়ে যায়।
পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আত্মহত্যার কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলো উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের আত্মহত্যা না করতে সচেতন করে তুলতে পারে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/152764