পরাশক্তিদের স্নায়ুযুদ্ধ ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত

পরাশক্তিদের স্নায়ুযুদ্ধ ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত

মোঃ রেজাউল করিম রাজু :  ২০২৬ সালটি বৈশ্বিক প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি স্পষ্ট বিভাজনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং চীনের উৎপাদন ও হার্ডওয়্যার দক্ষতার মধ্যে চলছে এক তীব্র প্রতিযোগিতা। এতদিন প্রযুক্তি ছিল মানুষের জীবন সহজ করার মাধ্যম, কিন্তু এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের মূল হাতিয়ার। এ বছর বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ফোকাস করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘সফট পাওয়ার’-এর ওপর, আর চীন জোর দিচ্ছে রোবোটিক্স ও ম্যানুফ্যাকচারিং বা ‘হার্ড পাওয়ার’-এর ওপর।

যুক্তরাষ্ট্র ও সিলিকন ভ্যালি: বুদ্ধিমত্তা ও অদৃশ্য প্রযুক্তির দৌড়

যুক্তরাষ্ট্রের টেক জায়ান্ট গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট এবং মেটা ২০২৬ সালে মূলত ‘কম্পিউটিং’ এর সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিকে হার্ডওয়্যার থেকে মুক্ত করে মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।

১. এজেন্টিক এআই ও জেনারেটিভ চ্যাটবটের বিদায় : ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ চ্যাটবট থেকে সরে এসে ‘অটোনোমাস এজেন্ট’ বা স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট চালু করছে। মাইক্রোসফট ও ওপেনএআই এমন সিস্টেম তৈরি করেছে যা কেবল প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং ইউজারের হয়ে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যেমন একাধিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে রিপোর্ট তৈরি করা, কোডিংয়ের ভুল শুধরে সফটওয়্যার রান করা, বা আইনি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া। অর্থাৎ, এআই এখন ‘প্যাসিভ’ থেকে ‘অ্যাক্টিভ’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

২. কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি বা আধিপত্য : আইবিএম  ও গুগল তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রজেক্টগুলোকে ল্যাবরেটরি থেকে বের করে বাণিজ্যিক রূপ দিচ্ছে। ২০২৬ সালে তারা এমন প্রসেসর উন্মোচন করেছে যা প্রচলিত সুপারকম্পিউটারের চেয়ে লক্ষ গুণ দ্রুত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সাইবার নিরাপত্তা, নতুন ওষুধের মলিকিউল আবিষ্কার এবং আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা।

৩. স্পেশিয়াল কম্পিউটিং ও স্ক্রিনলেস ফিউচার : অ্যাপল ও মেটা তাদের এআর  প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্টফোন পরবর্তী যুগের ভিত্তি গড়ে তুলছে। ২০২৬ সালে তাদের মূল পণ্য হলো নিউরাল ইন্টারফেসযুক্ত স্মার্ট গ্লাস। হাতের ইশারা বা চোখের পলকে ডিজিটাল জগতকে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রযুক্তি মূলত মানুষকে স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে চায়।

হার্ডওয়্যার বিপ্লব ও সিক্স-জি আধিপত্য : যুক্তরাষ্ট্র যখন সফটওয়্যারে মনোযোগ দিচ্ছে, চীন তখন ‘বাস্তব পৃথিবী’ পুনর্গঠনে ব্যস্ত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর চীন প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার যে নীতি নিয়েছিল, ২০২৬ সালে তার পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখা যাচ্ছে।

১. হিউম্যানয়ড রোবট ও শ্রমবাজার দখল: ২০২৬ সালে চীন বিশ্বের ‘রোবোটিক্স হাব’-এ পরিণত হয়েছে। শাওমি, টেনসেন্ট এবং চীনের অন্যান্য হার্ডওয়্যার জায়ান্টরা সস্তা ও দক্ষ হিউম্যানয়ড (মানুষের মতো দেখতে) রোবট বাজারে ছেড়েছে। কারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বয়স্কদের সেবা সব খাতেই এই রোবটগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনের লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের বিশাল ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরকে সম্পূর্ণ মানুষের শ্রমমুক্ত করা এবং এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করা।

২. সিক্স-জি নেটওয়ার্কের উন্মোচন:
ফাইভ-জির সফলতার পর চীন ২০২৬ সালে বিশ্বের প্রথম সিক্স-জি নেটওয়ার্কের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। এর গতি ফাইভ-জির চেয়ে ১০০ গুণ বেশি। চীনের হুয়াওয়ে এবং জেডটিই এর মাধ্যমে এই প্রযুক্তি মহাকাশের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়ে স্থল ও আকাশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করছে। এটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এবং স্মার্ট সিটির জন্য গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করছে।

৩. সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ স্বাধীনতা:
২০২৬ সালে চীনের এসএমআইসি এবং অন্যান্য চিপ নির্মাতারা পশ্চিমাদের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। তারা নিজস্ব আর্কিটেকচারের ওপর ভিত্তি করে উন্নত ন্যানোমিটারের চিপ তৈরি করছে, যা তাদের এআই সুপারকম্পিউটার এবং সামরিক ড্রোনগুলোকে সচল রাখছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অবরোধের বিরুদ্ধে চীনের সবচেয়ে বড় বিজয়।

ভবিষ্যতের সংঘাত: শক্তি ও মহাকাশ

এই দুই পরাশক্তির লড়াই এখন আর শুধু পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ নেই।

  • মহাকাশ অর্থনীতি: ২০২৬ সালে স্পেস-এক্স (যুক্তরাষ্ট্র) এবং চীনের জাতীয় মহাকাশ সংস্থার মধ্যে চাঁদে খনিজ আহরণ ও ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। বিরল মৃত্তিকা ধাতু  এবং হিলিয়াম-৩ সংগ্রহের জন্য দুই দেশই বিশাল বাজেট বরাদ্দ করেছে।
  • গ্রিন এনার্জি ও ব্যাটারি প্রযুক্তি: প্রযুক্তির এই বিশাল যজ্ঞ চালাতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। চীন বর্তমানে সলিড-স্টেট ব্যাটারি প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে, যা তাদের ইলেকট্রিক ভেইক্যাল মার্কেটকে বিশ্বসেরা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণায় ব্রেকথ্রু অর্জনের মাধ্যমে শক্তির সংকট মেটানোর চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালে প্রযুক্তি বিশ্ব পরিষ্কারভাবে দুটি ভিন্ন দর্শনে বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের দর্শন হলো ‘বুদ্ধিমত্তা ও বিমূর্ত উদ্ভাবন’, আর চীনের দর্শন হলো ‘উৎপাদন ও কাঠামোগত শক্তি’। ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ হলো আরও দ্রুতগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট রোবট এবং মানুষের মতো বুদ্ধিমান এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট। তবে দীর্ঘমেয়াদে, এই দুই পরাশক্তির প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে আগামী দশকের বিশ্ব অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য। যোগাযোগ করুন : rajuitnews@gmail.com

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/152492