দেশীয় মাছের বিলুপ্তিতে ত্রিমুখী সংকট
“মাছে ভাতে বাঙ্গালী” প্রবাদটির সার্থকতা আসলে রুই-কাতলার আভিজাত্যের ওপর নির্ভর করে না। বরং তা বাংলার ষোল কৈ, শিং, ও মাগুর মাছের মতো সহজলভ্য ও পুষ্টিকর মাছের প্রাচুর্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এই প্রবাদটি আজ তার মূল সার্থকতা হারিয়ে ফেলেছে। ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’ এখন আর দৈনন্দিন জীবনের চলমান চিত্র নয়, বরং তা যেন কালের স্রোতে ভেসে যাওয়া এক কাগুজে ঐতিহ্য বা নস্টালজিক স্মৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিপর্যয় ও দেশীয় মাছের অস্তিত্বের সংকটের মূলে রয়েছে কয়েকটি কারণ: প্রথমত, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর নদী-খালে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নিষ্কাশন বছরের পর বছর ধরে এক মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। কেমিক্যাল কারখানা, এমনকি হাসপাতালের বর্জ্যও এই দূষণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এই বিষাক্ত বর্জ্যগুলিতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নদীর জলের অক্সিজেন স্তর দ্রুত হ্রাস করছে, যা মাছের স্বাভাবিক জীবনচক্র ও প্রজননকে তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত করে। বিশেষত শীতকালে যখন পানির গভীরতা কমে যায়, তখন অক্সিজেন ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, বহু নদী ও খাল আজ আর মাছের নিরাপদ আবাসস্থল নেই বরং তা বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও, কৃষিখাতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রভাবও কম ভয়াবহ নয়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে আসা এই রাসায়নিক পদার্থগুলো মাঠ থেকে সরাসরি খাল-বিল ও জলাধারে মিশে যাচ্ছে এবং মাছের পোনা ও ডিম্বাণুকে ধ্বংস করছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক এলাকায় দৃশ্যত জলাধার থাকলেও, জলের গুণগত মান মাছের জীবনধারণের উপযোগী না হওয়ায় জলাশয়গুলি মাছশূন্য হয়ে পড়ছে।
এছাড়া দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত আহরণ। প্রাকৃতিক উৎস থেকে নির্বিচারে মাছ ধরা দীর্ঘদিন ধরে চললেও, বর্তমানে তা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা, প্রজনন মৌসুমে জাল ফেলা এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার মাছের প্রাকৃতিক বৃদ্ধির চক্রকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে বড় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমছে এবং ছোট পোনাগুলোও বড় হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। নদী বা হাওরের অনেক জায়গায় এখন জাল টানলে কাক্সিক্ষত মাছ পাওয়া যায় না। তৃতীয়ত, নদীর গতিপ্রবাহে বাধা ও সংকট পাশাপাশি, নদীর গতিপ্রবাহ পরিবর্তন, যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ এবং সেতুর কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া মাছের জন্য আরেকটি বড় সংকট তৈরি করেছে। প্রজননের সময় অনেক প্রজাতির মাছ উজানে উঠতে চায়, কিন্তু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় তারা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের ডিম উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
সংকট উত্তরণ করা এখন অতিব জরুরি হয়ে উঠেছে এর জন্য সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিৎ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক আহরণ ব্যবস্থাপনা করা। এই দুই ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের কঠোরতা জলাশয় দূষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ হলো প্রথম ও প্রধান কাজ। দেশের শিল্প-কারখানাগুলো থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনের পূর্বে ইটিপি বা পরিশোধন যন্ত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু বাধ্যতামূলক করাই নয়, নিয়ম ভাঙলে কঠোর শাস্তি ও জরিমানা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইন প্রয়োগে কোনো শিথিলতা রাখা চলবে না। এছাড়া কৃষিখাতে বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত করা এবং আইপিএম বা সমন্বিত বালাই দমন পদ্ধতির মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্প পদ্ধতির প্রচলন করা এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক বৃদ্ধিচক্রকে সুরক্ষিত রাখতে আহরণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। এরজন্য প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নিয়ম আরও কঠোরভাবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল সহ সকল ক্ষতিকারক জাল নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং জনগণের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে সামাজিক সচেতনতা। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধে কখনোই জয় মেলে না। তাই এখনই সময় নদীকে তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে দেওয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত আহরণ বন্ধ এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার। অন্যথায় খুব দ্রুতই দেশীয় মাছের নাম শুধু বইয়ের পাতায় টিকে থাকবে; আমাদের খাবারের প্লেটে নয়।
লেখক
ইশতিয়াক ইসা
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।