মনিটাইজেশনের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিত্ব

মনিটাইজেশনের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিত্ব

একসময় বিকেলবেলা ছাদে বসে গল্প করা, বই পড়া কিংবা মাঠে বসে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ছিল স্বাভাবিক আনন্দ। আজ সেই সময় হারিয়ে যাচ্ছে লাইক, কমেন্ট ও ভিউয়ের নেশায় মোবাইলের পর্দায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম-ই নয়; এটি হয়ে উঠেছে আত্মপ্রদর্শন, প্রতিযোগিতা ও অর্থ উপার্জনের এক জটিল মঞ্চ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক তরুণদের কাছে আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি উপার্জনেরও সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু মনিটাইজেশন ধীরে ধীরে এমন এক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে, যা ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও সামাজিক ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। 

একসময় মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা বা প্রতিভা ভাগাভাগি করত নিছক আনন্দের জন্য। এখন সেটি রূপ নিয়েছে সংখ্যার নেশায় অর্থাৎ কে কত লাইক পেল, কত ভিউ পেল। রান্না, ভ্রমণ বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত সবই এখন কনটেন্ট। দেখা যায়, অশালীন বা চটকদার কনটেন্টই বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। শিক্ষিত ও ভদ্র তরুণ-তরুণীরাও এই ফাঁদে পড়ে নিজেদের  স্বকীয়তা হারাচ্ছে। এতে আত্মপরিচয়ে বিভ্রান্ত এবং সমাজে নৈতিক মানদন্ডের অবক্ষয় ঘটছে।  মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে সোশ্যাল ভ্যালিডেশন এডিকশন বা সামাজিক স্বীকৃতির নেশা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ২০২৪ সালের আমেরিক্যান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক স্বীকৃতির উপর নির্ভরশীল জীবনযাপন আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হতাশা, উদ্বেগ ও একাকীত্বের জন্ম দেয়। মানুষ তখন নিজের মূল্যবোধ নয়, অন্যের প্রতিক্রিয়াকে নিজের পরিচয়ের মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪.৫ কোটি সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছে, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন। তাদের অনেকেই ফেসবুকের মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, অধিকাংশ কনটেন্ট ক্রিয়েটর জানেন না কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। অর্থের প্রলোভনে অনেকেই এমন কনটেন্ট বানাচ্ছেন যা সামাজিক শালীনতা ও নৈতিক সীমা অতিক্রম করছে।

কেউ কেউ যুক্তি দেন, মনিটাইজেশন তরুণদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে। সত্যিই, এটি ঘরে বসে অর্থ উপার্জনের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই প্রতিযোগিতা মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে গ্রাস করতে শুরু করে। যেমনটা দেখা গিয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ঘটে যাওয়া জনপ্রিয় এক নারী টিকটকারের অশালীন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এটি প্রমাণ করে, ডিজিটাল পরিচয়ের পেছনে ছুটে অনেকেই বাস্তব জীবনের মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বিতর্কিত বা চটকদার কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়। দর্শকের আবেগকে তাড়িত করে এমন কনটেন্টকে অ্যালগরিদম অগ্রাধিকার দেয়। ফলে শিক্ষণীয় ও গঠনমূলক কনটেন্ট নিচে পড়ে যায়। ফলে কনটেন্ট নির্মাণে প্রতিযোগিতা নয়, অনৈতিক দৌড় চলে কে বেশি ভিউ পাবে, কে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করবে। অনেক তরুণ বাস্তব জীবনের ঘটনা, সম্পর্ক এমনকি পারিবারিক কলহকেও কনটেন্টে রূপান্তর করছে। এতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই এক ধরনের ডিজিটাল নাট্যমঞ্চে পরিণত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সমস্যার মূল কারণ হলো ডিজিটাল নৈতিকতা শিক্ষার অভাব। আমাদের দেশের পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসি বা ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেখাতে উদাসীন। অথচ এটি সময়ের দাবি হওয়া উচিত। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই যদি শেখানো হয় কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করতে হয়, তবে প্রবণতাটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

 রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পদক্ষেপ জরুরি। কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য নৈতিক গাইডলাইন, ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কারণ, মনিটাইজেশনের সুযোগ যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি সঠিক নির্দেশনা ছাড়া সামাজিক অস্থিরতাও বাড়িয়ে তুলছে। মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের আসল শক্তি তার মূল্যবোধ, আত্মসম্মান ও মানবিকতায় নিহিত।  লাইক,  কমেন্ট, শেয়ারের মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নয় বরং আত্মসম্মানই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

লেখক


মো: শাহিন আলম 

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/148376