৯ বাম দলের নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’
বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ৯টি দল নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে বৃহত্তর জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন এই জোটটি একসঙ্গে আন্দোলন ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। বামপন্থিদের জাতীয় কনভেনশন থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই জাতীয় কনভেনশন শুরু হয়। বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ এটির আয়োজন করে।
জোটে যারা থাকছেন- এখন পর্যন্ত মোট ৯টি দল নতুন জোটে যুক্ত হওয়ার সম্মতি দিয়েছে। এর মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ছয় শরিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও বাসদ (মার্কসবাদী) রয়েছে। শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ এবং প্রয়াত বামপন্থি নেতা পংকজ ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ন্যাপ নতুন জোটে যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার শরিক চারটি দলের মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মাহবুব) নতুন জোটে যুক্ত হতে সম্মতি দিয়েছে। এই জোটের অন্য শরিক দল গণমুক্তি ইউনিয়ন আজকের জাতীয় কনভেনশনে যোগ দেবে। অন্য দুই শরিক বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন ও নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চারও পরে এ জোটে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
কনভেনশনের খসড়া ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফী রতন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, জনগণ আজ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, দেশ ও দেশবাসীর জন্য সুখ-শান্তি-স্বস্তি ও প্রতিশ্রুতিময় নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রগতিমুখীন গণতান্ত্রিক ধারার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের সকল দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল-বাম রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী তথা বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী সংগঠনসমূহ, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহসহ, অধিকার আন্দোলনের কর্মী এবং অপরাপর সব শক্তির সম্মিলনে আমরা ‘জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি’ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
এতে আরও বলা হয়, এই কনভেনশন থেকে আমরা সবার অংশগ্রহণে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের প্রস্তাব করছি এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মূল অঙ্গীকার হিসাবে খসড়া ঘোষণা ও কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করছি। পক্ষকালব্যাপী সারা দেশে ব্যাপক জনগণের সাথে নিবিড় আলোচনা ও তাদের মতামত-পরামর্শের আলোকে এই খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। জেলায় জেলায় কনভেনশন বা মতবিনিময় সভার মাধ্যমে এই যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম অংশগ্রহণকারী দল-সংগঠনের প্রতিনিধি ও দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা প্রগতিশীল ব্যক্তবর্গের সমন্বয়ে গঠিত ‘পরিচালনা কমিটি’ কর্তৃক পরিচালিত হবে। ‘যৌথ নেতৃত্বের’ ধারায় পরিচালনা কমিটি তার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের মাধ্যমে আজ জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার যে সূচনা আজকের কনভেনশনের মাধ্যমে করা হলো, তার কর্মকাণ্ডে শামিল হওয়ার জন্য দেশের অপরাপর সব গণতন্ত্রমনা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা সমিতি ও ব্যক্তির প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন ও স্বাগত বক্তব্য দেন বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, জুলাই সনদে বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে৷ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিস্থাপন করতে চায়৷ এখনও সেই লুটপাট ও দুর্নীতির ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে৷ এ কারণে এখন জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক উত্থান জরুরি।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, আজ থেকে বাম দলগুলোর কর্মীদের একটাই পরিচয় হবে৷ তা হলো আমরা সবাই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের মানুষ৷ গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন তিনি।
শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, যেভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে, এখন শিল্পী, কৃষক, শ্রমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার মানুষকে একতাবদ্ধ হতে হবে।
মব ভায়োলেন্সে ইন্ধনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ইন্ধন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ জাসদ সভাপতি৷ শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, এসব অপকর্মের পেছনে ইউনূস সাহেব স্বয়ং জড়িত৷ এসব কিছুতে তার হাত নেই, তা একদিন প্রমাণ করতে হবে৷ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ভাবছেন, তারা যা খুশি তাই করবেন৷ কিন্তু এ দেশের মানুষ তা করতে দেবে না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও এর আকাঙ্খা বাস্তবায়ন হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের ১৫ মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে যে, এবারের বিজয়ও হাতছাড়া হতে চলেছে। দেশ এখনও যে গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট, নৈরাজ্য, দুর্নীতি, লুঠন, অবক্ষয়ের মধ্যে রয়েছে। অধিকারহীনতা-গণতন্ত্রহীনতার যে শাসন ব্যবস্থা দেশে চলছে, তার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার ভিত্তিতে মৌলিক ধারায় পরিবর্তন ছাড়া এ সংকটের আবর্ত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, সর্বগ্রাসী সংকট থেকে জনগণের মুক্তির জন্য বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিকদের সমন্বয়ে ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ গড়ে তুলতে হবে। বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে হবে।
কনভেনশনে সংহতি বক্তব্য রাখেন প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নেতারা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/148334