উদ্বোধনের আর মাত্র
০০
দিন
০০
ঘণ্টা
০০
মিনিট
০০
সেকেন্ড

শ্রাবণীর বাচিক শিল্পী থেকে শিক্ষার বাতিঘর হয়ে ওঠার গল্প

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২২, ০১:৫১ দুপুর
আপডেট: জুন ২৪, ২০২২, ০১:৫১ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

নাসিমা সুলতানা ছুটু : কবিতাই যার ধ্যান-জ্ঞান, আবৃত্তিই যাকে বেঁচে থাকার রসদ জোগায় তিনি হলেন সুলতানা পারভীন শ্রাবণী। মফস্বল শহরে বাস করলেও ভিন্ন ধাঁচের চর্চার মাধ্যমে আবৃত্তিকে যেমন নিয়ে গেছেন অনন্য এক মর্যাদায় তেমনি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও কুড়িয়েছেন সুনাম। বাচিক শিল্পী হিসেবে খ্যাতি পেলেও একই সঙ্গে শিক্ষার বাতিঘর হিসেবেও তিনি পরিচিত। প্রতি মুহূর্তে আলো ছড়াচ্ছেন শিক্ষার। আবৃত্তি ও শিক্ষার পাশাপাশি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও চারিদিকে ছড়িয়ে  পড়েছে তার সুনাম। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে। তাইতো কবিতায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য শিল্পকলা একাডেমি থেকে সদ্য পাওয়া সম্মাননার পূরো অর্থই তিনি তুলে দিয়েছেন সিলেটের বানভাসি মানুষদের সহযোগিতায়। এতকিছুর সাথে নিজেকে যুক্ত করা সুলতানা পারভীন শ্রাবণীর শুরুটা অবশ্য সহজ ছিল না। এগিয়ে চলার এই পথটি তার জন্য ছিল বেশ কঠিন। শ্রাবণীর জীবন যেন রবীন্দ্রনাথের সেই কথার মত-‘সত্য যে কঠিন, কঠিনরে ভালোবাসিলে সে কখনও করে না বঞ্চনা’।

বগুড়া শহরের চক সূত্রাপুর এলাকার ব্যবসায়ী সহিদুল ইসলাম এবং গৃহিণী হোসনে আরা বেগমের চার কন্যার মধ্যে সবার মেজো শ্রাবণী বাল্য বিয়ের শিকার। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তাকে বিয়ের পীড়িতে বসতে হয়। নিজের বিয়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শ্রাবণী বলেন, ‘নানা ছিলেন বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তার সঙ্গে সখ্য ছিল বগুড়া শহরের ব্যবসায়ী মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের। তার বড় ছেলে রবিউল ইসলামের সঙ্গে আমার বিয়ে পাকা করেন নানাজান। বিয়ে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই।’ ৮০ ভরি স্বর্ণালংকারে সাজিয়ে শহরের কাটনারপাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে নেওয়া হয় শ্রাবণীকে। কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে গিয়ে জীবন পাল্টে যায়। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিয়ের ডালার সঙ্গে বোরকা ও হিজাব পাঠানো হয়। ওই বাড়িতে যাওয়ার পর শুরু হয় বন্দিজীবন। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানোও নিষেধ। মা-বাবা ও বোন ছাড়া অন্য কোনো আত্মীয়ের সেখানে আসা নিষেধ। বাসার ল্যান্ডফোন থাকত লক করা। শ্বশুরের কড়া শাসনে স্বামীর সঙ্গেও ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। এমন প্রতিকূল পরিবেশে যখন হাঁপিয়ে উঠছিলেন শ্রাবণী তখন কান্ডারী হিসেবে দেখা দেন তার এক সময়ের গৃহশিক্ষক আবুল হোসেন। বিয়ের কয়েক মাস পর বাবার বাড়ি গেলে ওই গৃহ-শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয় শ্রাবণীর। তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানাতেই গোপনে স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে এক সেট বই কিনে দেন আবুল হোসেন। কাপড়ের ব্যাগে সেই বই লুকিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ফেরেন। গোপনে পড়াশোনা করতেন। স্বামী-শ্বশুর বাসায় আসার আগেই বই খাতা লুকিয়ে ফেলতেন। তবে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে শাশুড়ি মা’র সহযোগিতা ছিল অপরিসীম। পরবর্তীতে স্বামী রবিউল ইসলামও তাকে সহযোগিতা করেন। শ্বশুরের চোখ ফাঁকি দিয়েই ১৯৯৫ সালে শ্রাবণী এসএসসি পাশ করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হলেও ক্লাস করা হয়নি। দুই বছর পর পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা আটকে যায়। ১৯৯৮ সালে চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে পাশ করেন। এরপর মনোবল ও সাহস আরও বেড়ে যায় শ্রাবণীর। ভর্তি হন মহাস্থান ডিগ্রি কলেজে। ওই বছরের ডিসেম্বরে কন্যা সন্তানের মা হন। সংসার সন্তান সামলে চালিয়ে যান পড়ালেখা। দ্বিতীয় সন্তান পেটে নিয়েই ডিগ্রি পরীক্ষায় অংশ নেন। পান দ্বিতীয় বিভাগ। ২০০২ সালে আরেক সন্তানের মা হন। শিশুসন্তান সামলে স্নাতকোত্তর পূর্বভাগে ভর্তি হন সরকারি আজিজুল হক কলেজে। মাস্টার্স শেষে বই পড়ার প্রতি তার আসক্তি বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে কবিতা। বিভিন্ন কবির কবিতার বই পড়েন আর ঘরের ভেতর গুনগুন করে আবৃত্তি করতে থাকেন। তত দিনে ছেলেমেয়েরাও একটু একটু করে বড় হচ্ছে। আবৃত্তি শেখার ঝোঁক থেকে ২০০০ সালে দৃষ্টি বগুড়া নামে একটি সংগঠনে ভর্তি হন। বোরকায় মুখ ঢেকে আসা-যাওয়া করতেন। সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমিতে গান শিখতেও শুরু করেন।

সেসব দিনের স্মৃতিচারণা করে অগ্রগামী এ নারী বলেন, ‘ধীরে ধীরে মঞ্চে আবৃত্তির ডাক আসতে শুরু করে। অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরে গেট বন্ধ পেতাম। প্রাচীর টপকে বাসায় ঢুকতাম। শাশুড়ি সব জানতেন। এরপর ঢাকা ও রাজশাহী শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়মিত আবৃত্তির অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করি।’ ২০০৯ সালেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে (এমবিএ) এবং ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেন শ্রাবণী । ২০১৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এমফিল কোর্সে। সেখানে মান্তা সম্প্রদায়ের ওপর গবেষণার কাজ করছেন।

সুলতানা পারভীন বলেন, ২০১২ সালে বগুড়ার সোনাতলা সরকারি নাজির আখতার কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই তার শ্বশুর মারা যান। এরপর বিয়েতে পাওয়া গয়না বিক্রি করে এবং বাবার দেওয়া অর্থ দিয়ে শ্বশুরের নামে করেন হাজী মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন কমার্স কলেজ। সুবিধাবঞ্চিত ছয়জন শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৮ সালে একই ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করেছেন বেগম হোসনে আরা বিদ্যালয়। শ্রাবণী বলেন, ‘শহর থেকে একটু দুরে কিছুটা অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে তোলার মূল কারণ পিছিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের ভিতর শিক্ষার আলো ছড়ানো। ওই এলাকায় ভালো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। অনেক দূরে এসে সব পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া করাও সম্ভব হতো না। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই ঝরে পড়তো। কিন্তু এই স্কুল এবং কলেজটি হওয়ায় ওই এলাকায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখন অনেক কমে এসেছে। শ্রমিকদের সঙ্গে থেকে আমি নিজে একটি একটি করে ইট গেঁথে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। এজন্য ওই এলাকার স্থানীয়রাসহ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের কেউ কেউ আমাকে লেবার অধ্যাপক বলে ডাকেন’। 

শ্রাবণী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন আবৃত্তিতে। ব্যক্তিগতভাবে আবৃত্তি চর্চার পাশাপাশি আবৃত্তির সাংগঠনিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন। দলের জন্য অসংখ্য আবৃত্তি প্রযোজনা নির্মান করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন। সঙ্গীত ও দৃশ্যকাব্যের সংযোজনে আবৃত্তিতে রুপ দিয়েছেন ভিন্নমাত্রা। দেশের গন্ডি পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, মালয়েশিয়া, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে আবৃত্তি করেছেন, তুলে ধরেছেন দেশের লোকজ সংস্কৃতি। ‘স্বপ্নের চোখে জল’ ও ‘জলের তোড়ে টান পড়েছে’ নামে তার দুটি আবৃত্তির সিডি প্রকাশ হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত আবৃত্তি ও সঙ্গীত বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। ‘কবিতা চৌকাঠ’ নামে নিজের একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে নিয়মিত আবৃত্তি করছেন শ্রাবণী। এছাড়া তিনি পেয়েছেন দেশি-বিদেশি নানা সম্মাননা। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির আবৃত্তি শাখার বিচারক তিনি।

শ্রাবণী শিক্ষা ও সাংস্কৃতির পাশাপাশি নিজেকে জড়িত রেখেছেন নানা সামাজিক কর্মকান্ডে। তিনি গড়ে তুলেছেন শ্রাবণী সুলতানা রক্তদান কেন্দ্র। রোটারী ক্লাব অব বগুড়ার একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি বিভিন্ন মানবসেবা মূলক কাজেও অংশ নেন। রোটারি ক্লাবের আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার ও শিক্ষা সফর হিসেবে ভ্রমন করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে। সমাজ এবং অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে চাওয়া থেকেই তিনি বগুড়া শিল্পকলা একাডেমি থেকে সদ্য পাওয়া সম্মাননার পূরো অর্থই সিলেটের বানভাসিদের সহযোগিতায় দান করেছেন। একই সঙ্গে তার পরিচালনায় দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্লাড ডোনেশন ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতায় আরও কিছু অর্থ ওই বানভাসিদের দিতে চান। পাশাপাশি তার সম্মাননাটুকু দেশের সকল লড়াকু নারীদের জন্য উৎসর্গ করেছেন বলে জানান। শ্রাবণী বগুড়া সদরের শিশু ও নারী সচেতনামূলক ফাউন্ডেশন সোসাইটি ফর হেলথ এডুকেশন এন্ড বেসিক এডভান্সমেন্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি তিনি। এছাড়া শ্রাবণী রবিউল আর্ট প্রেস ও শ্রাবণী সুলতানা ডেইরি ফার্মের পরিচালক।

শ্রাবণী বলেন, আবৃত্তির মধ্য দিয়ে দেশকে তুলে ধরি দেশের বাইরেও। সর্বধর্মের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও বাঙালির হাজার বছরের লোকাচার, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে একটা গণআন্দোলন- এসবই আমার আবৃত্তির উপাচার, জীবনাচার। আমার সব কিছুর মূলে এক জন নারী একটু স্বাধীনচেতা হোক নিজের বিবেচনা বোধটা নিজের মধ্যে জন্ম নিক যাতে সে যে কোন অন্যায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতে পারে। যে কোন অবিচারের সে দাঁড়াতে পারে। এই যে দাঁড়াতে পারার জন্য তার যে শক্ত মেরুদন্ডের দরকার সাহস দরকার সেটার জন্য মানুষের ভেতর থেকে তৈরি হতে হয় সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক বিভিন্ন্  সংগঠনের সাথে যারা কিনা  মানুষের জীবন সম্পর্কিত সচেতনতা-সহযোগিতা মূলক কাজে  মানবতাকে সামনে রেখে কাজ করে । তা না হলে একজন মানুষ ভিরু মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠে সাহসী মানুষ হয় না । আমি আপদমস্তকে একজন সাহসী মানুষ হতে চেয়েছি  এবং চাই।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়